ভাদুগান ও ভাদু উত্সব- 2020 (প্রথম পর্ব) ভাদুর কাহিনী, আলোচনা ও গীতিকবিতা

ভাদুগান ও ভাদু উত্সব- 2020 (প্রথম পর্ব)
ভাদুর কাহিনী, আলোচনা ও গীত সংকলন

তথ্যসংগ্রহ ও কলমে-লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী



১৮৫৭ -র মহাবিদ্রোহে যে রাজারা যোগ দিয়েছিলেন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পঞ্চকোটরাজ নীলমণি সিংহ দেও৷ পুরুলিয়ার প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক দিলীপ গোস্বামী বলেন , ‘লোককথা অনুযায়ী , নীলমণি সিংহের কন্যা ছিলেন ভদ্রাবতী বা ভাদু৷ তাঁর অকালমৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিতে ভাদু উত্সবের প্রচলন হয় রাজবাড়িতে৷ ’

ভাদ্র মাসের পয়লা দিনে রাজবাড়িতে ভাদুর মূর্তি স্থাপন করা হত৷ অন্তঃপুরের মহিলারা প্রতি রাতে ভাদুর সামনে বসে গান করে ভাদু উত্সব করতেন৷ ভাদ্র সংক্রান্তির দিন সারা রাত জেগে হত ভাদু উত্সব৷ এই দিনটিকে বলা হয় ভাদুর জাগরণ৷ পয়লা আশ্বিন ভাদু বিসর্জন৷ কাশীপুর রাজবাড়িতে সুনসান গেটের সামনে নির্লিন্ত বসেছিলেন অবাঙালি দারোয়ান৷ ভাদুর কথা উঠতেই বলে উঠলেন , ‘এখানে কে ভাদু করবে ? রাজকন্যা লখনৌতে থাকেন৷ আসেন পুজোর সময়৷ ’

লোককথা অনুযায়ী , কারাবন্দি প্রেমিক অঞ্জনের খোঁজে গান গেয়ে গেয়ে ঘুরে বেরিয়েছিলেন ভাদু৷ তাই মন্ত্রোচ্চারণ নয় , লোকায়ত সুরেই হয় ভাদুর বন্দনা৷ নিবেদন করা হয় খাজা -গজা , জিলিপি , লাড্ডু৷ নীলমণি সিংহের রাজত্ব বাজেয়ান্ত করেছিল ব্রিটিশরা৷ সেই রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য নীলমণি ব্রিটিশ আদালতে আবেদন করেছিলেন৷ রাজার আইন উপদেষ্টার চাকরি নিয়ে সেই সময় পুরুলিয়া আসেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত৷ রাজবাড়ির ভাদু উত্সবে যোগ দিতেন কবি৷ লিখেছিলেন কয়েকটি ভাদু গানও৷

ঐতিহ্যের এই ভাদু উত্সব এখন রাজবাড়ি থেকে হারিয়ে গেলেও টিকে রয়েছে কাশীপুরের কিছু মহল্লায়৷ সঞ্জয় সূত্রধর , ষষ্ঠীপদ বাউড়ি , বাবলু মোদক , সুশীল শা -রা এখনও ভাদ্র সংক্রান্তিতে ভাদু গানের আসর বসান৷ তবে তা রাজকীয় মর্যাদা পায় না৷

মানভূমের গ্রামাঞ্চলে ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজোকেও ছাপিয়ে যায় ভাদু৷ মেয়েরা কুমোর বাড়ি থেকে ভাদু মূর্তি কিনে এনে গ্রামে স্থাপন করেন৷ ভাদু গানে কখনও দৈনন্দিন জীবন কখনও বা চাওয়া -পাওয়ার যন্ত্রণা ফুটে ওঠে৷

‘ভাদু আমার ছোট ছেলে , কাপড় পড়তে জানে না ’ (পুরুলিয়ায় শিশুদের লিঙ্গ নির্বিশেষে ছেল্যা >ছেলে বলা হয় )৷

ভাদুর গীতে ক্রমশ উহ্য হয়েছেন খোদ ভাদুই৷ এসেছে রামায়ণ -মহাভারতের কাহিনি৷ ‘রামের মা সিনাতে গেল , রাম কাঁদে ধুলায় পড়ে / কেনে গরবি ধুলা দিলি / ধুলা ঝাড়ে লিই কোলে৷ ’

ভাদু গানের আসর  আমার গীতিকবিতা-1
কথা – আঞ্চলিক সুর – অপ্রচলিত (তাল- দাদরা)

ও ভাদু মা ও ভাদু মা ফেলছো কেনো চোখের জল,
কি হয়েছে বলো মা আমায় খেতো দেবো রম্ভা ফল।

ও ভাদু মা ও ভাদু মা……..

আমার ভাদু রাগ করেছে কথা সে আর কইবে না,
ও ভাদু মা এই বয়েসে রাগ করা আর সাজে না।
ও ভাদু মা ও ভাদু মা……..

ও পাড়া যেও না ভাদু মা, ও পাড়া যেতে মানা,
ও পাড়াতে সতীন আছে ধরলে পরে ছাড়ে না।

ও ভাদু মা ও ভাদু মা……..

ওপর কুলি নামু কুলি মাঝ কুলিতে গোল হচ্যা,
আমার ভাদু ছুটু ছ্যালা ঘরে ফিরতে লারিছ্যা।

ও ভাদু মা ও ভাদু মা……..

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes