‘বসন্ত এলো আজি’ প্রথম পর্ব

‘বসন্ত এলো আজি’ প্রথম পর্ব।
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারীর বসন্তের কবিতাগুচ্ছ

ভূমিকা
নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান। তবু বিবিধের মাঝে দোলের মাহাত্ম্য কিন্তু মিলনে। দোল বা হোলি নামের মাহাত্ম্যের সাথে আবার অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এক যুগাবতারের নাম। সকলের প্রিয়, সকলের আরাধ্য নন্দদুলাল শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণের হাত ধরেই ভারতভূমিতে হোলির সূত্রপাত বলে মেনে নেয় লোকগাথা। শ্রীকৃষ্ণকে কেন্দ্র করেই হোলির সূত্রপাত, একথা মানলেও মহাকাব্য থেকে লোকগাথায় দোল শুরুর কারণে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। কত যে কাহিনি মহাকাব্য থেকে লোকমুখে ঘোরে তা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়।

দোল বা হোলি, যে নামেই তাকে ডাকা হোক, ফাগের মিষ্টি সুবাসে তা চিরন্তন প্রেমের দোলা দিয়ে যায় মনে। সেই প্রেম কখনও মননের, কখনও বা শরীরী। সেই প্রেম আদি অনন্ত। গোপিনী শ্রেষ্ঠা রাই ও গোপ শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের অনুরাগের রঙে সেই প্রেম দ্বাপরে ধারণ করেছিল মনোহর কায়া। রাধা ও কৃষ্ণের যুগললীলায় দোল আজ পেয়েছে এক বিশ্বজনীন রূপ।

বসন্ত উত্সবে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত সম্পদায়ের মানুষ খুশির রঙে সবাই মেতে ওঠেন। হোলি এসে গেলো। এলো রাঙা আবীরের রঙে মনকে রাঙিয়ে দেবার দিন। তাই এই পূণ্য শুভলগ্নে প্রকাশিত হলো আমার কবিতাগুচ্ছ নিয়ে ‘বসন্ত এলো আজি’ প্রথম পর্ব। কবিতাগুলি সহৃদয় পাঠকবর্গের কাছে সমাদর পেলে আমার লেখা সার্থক হবে। বাংলা কবিতা আসরের সকলকে জানাই আবীর শুভেচ্ছা।
বিনীত-
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
নারায়ণা বিহার
নতুন দিল্লি-110028

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি– ১
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

”রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে,
তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে,
অশ্রুজলের করুণ রাগে …
মেঘের বুকে যেমন মেঘের মন্দ্র জাগে,
তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও”

রঙ খেলার উৎসব দোলযাত্রা। রঙ, আবির, গুলালে জীবনকে রঙিন করে তোলার নতুন এক আহ্বান দেয় দোল। বৈষ্ণব বিশ্বাসীদের মতানুসারে, ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে বৃন্দাবনের নন্দকাননে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধিকা দেবী এবং তার সখী ও অন্যান্য গোপীর সাথে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। এই দিনকে স্মরণ করতেই দোলযাত্রার সূচনা হয়েছিলো। তাই প্রত্যেক বছর ফাগুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে, প্রচলিত পঞ্জিকা অনুসারে, ১৪তম রাতের পরবর্তী দিনে উদযাপিত হয় দোল। পণ্ডিতদের মতে, রাধাকৃষ্ণের দোলনায় দোল বা দোলায় গমন করা থেকেই ‘দোল’ কথাটির উৎপত্তি। এই দিন রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ গুলালে স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে সকালেই বেরিয়ে পড়েন ভক্তরা। এরপর শুরু হয় রঙ ছুঁড়াছুঁড়ির পালা। একে অন্যকে কতখানি রাঙিয়ে তুললো, সেই প্রতিযোগিতায় মাতা হয়।

কিন্তু কীভাবে এলো এই উৎসব? অনেকেরই জানা নেই হয়তো সঠিক ইতিহাসটি। দোলযাত্রা বা হোলির সাথে মিশে আছে ধর্মের সব পৌরাণিক কাহিনী এবং লোকবিশ্বাস। আছে বিষ্ণু, দৈত্য, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের নানা পুরাকথা। দোলযাত্রা এবং হোলিকে আমরা একই উৎসব বলে জেনে থাকি। তবে আক্ষরিক অর্থে তাদের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। স্থানভেদে একেক বিশ্বাসে এবং নানা উপায়ে পালন করা হয় দোল এবং হোলি, কিন্তু মূল সুরটি একই। সামান্য তফাৎটা কোথায়, তাহলে জেনে নেওয়া যাক।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আর্য জাতি সূচনা করেছে রঙ খেলার। আবার এমনটাও জানা যায় যে, খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে থেকেই হোলি উদযাপিত হয়ে আসছে এই ধরায়। প্রাচীনকালের পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যে নাকি এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছিল। দোলের কথা লেখা আছে পবিত্র গ্রন্থ বেদ এবং পুরাণেও। ৭০০ শতকের দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের সময়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা একটি প্রেমের নাটিকাতে হোলি উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে খোদাই করা চিত্রকর্মে হোলি খেলার নমুনা বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে বলে দাবি করেন বিশ্বাসীরা। তাহলে বলতে হয়, হোলি বেশ প্রাচীন একটি উৎসব।

ইংরেজদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল দোল উৎসব। প্রথমদিকে এই উৎসবকে তারা রোমান উৎসব ‘ল্যুপেরক্যালিয়া’ হিসেবেই মনে করেছিল। অনেকে অবশ্য একে গ্রিকদের উৎসব ‘ব্যাকানালিয়া’র সঙ্গেও তুলনা করেছিল।

বিষ্ণু কথন ও হোলি

এ গেলো বহুদিন আগের কথা। এবার দেখা যাক, পুরাণে কী বলে? স্কন্ধ পুরাণের ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান বর্ণিত আছে। দৈত্যরাজা হিরণ্যকশিপুর অমরত্ব লাভ করার ইচ্ছা জাগলো। অমরত্ব বরপ্রাপ্তির জন্য তিনি কঠোর ধ্যানে মগ্ন হলেন। কিন্তু অমরত্ব লাভ কি অত সোজা? তিনি অমর হলেন বটে, তবে পরোক্ষভাবে। যে বর তিনি ধ্যানের মাধ্যমে লাভ করলেন, তা তাকে পাঁচটি বিশেষ ক্ষমতা দান করলো। তাকে কোনো মানুষ হত্যা করতে পারবে না, আবার কোনো প্রাণীও হত্যা করতে পারবে না; তাকে ঘরে হত্যা করা যাবে না, আবার বাইরেও হত্যা করা যাবে না; তাকে দিনে হত্যা করা যাবে না, আবার রাতেও হত্যা করা যাবে না এবং তাকে স্থল, জল বা বায়ু কোথাও হত্যা করা যাবে না। এই বর লাভ করে রাজা হিরণ্যকশিপু অহংকারী ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠলেন। তার অহংকার এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকলো যে তিনি নিজেকে দেবতাসম মনে করা শুরু করলেন।

তিনি চাইলেন, মানুষ এখন থেকে তাকে পূজা করবে এবং কেউ যদি তার আদেশ অমান্য করে তবে তাকে তিনি শাস্তি দেবেন, এমনকি হত্যাও করবেন। কেউ সানন্দে, কেউ ভয়ে তাকে পূজা করলো দেবতাতুল্য ভেবে, কিন্তু তার পুত্রই তার সাথে সম্মত হননি। পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন একজন পরম বিষ্ণুভক্ত। তাই তিনি তার পিতার দেবতা হওয়ার অমূলক ভাবনাকে অস্বীকার করে বিষ্ণু পূজা জারি রাখলেন।

পুত্রের এত বড় স্পর্ধা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না রাজা। অনেকভাবে চেষ্টা করলেন পুত্রের বিষ্ণুভক্তি দূর করার। কোনোভাবেই যখন পুত্রকে পূজা দিতে রাজি করাতে পারলেন না, তখন রাগে ক্ষোভে পুত্রহত্যার কথা চিন্তা করলেন তিনি। পুত্রকে তো আর নিজ হাতে খুন করা পারেন না, তাই ষড়যন্ত্র শুরু করলেন। হিরণ্যকশিপু শরণাপন্ন হলেন বোন হোলিকার কাছে। হোলিকা বরপ্রাপ্তা ছিলেন। তিনি বর পেয়েছিলেন যে, অগ্নি তাকে বধ করতে পারবে না। হোলিকা তার ভাইপোর কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে দাদার সাথে সহমত পোষণ করলো। দুই ভাইবোনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হিরণ্যকশিপু হোলিকার কোলে বালক প্রহ্লাদকে বসিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন গায়ে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। এতে মৃত্যু একজনের হলো বটে, তবে প্রহ্লা্দের নয়, হোলিকার। ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ডে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হরিনাম করতে করতে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে এলেন কিন্তু হোলিকা প্রাপ্ত বরের অপব্যবহার করায় আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেল। এই কাণ্ড দেখে তো দৈত্যরাজ অবাক!

বোন হারানোর শোক ভুলে হিরণ্যকশিপু আরও ক্রোধান্বিত হয়ে উঠলেন। পুত্রকে এবার নিজেই আক্রমণ করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু এবারও বিফলে গেলো তার চাল। কেননা ভগবান বিষ্ণু ফের রক্ষা করলেন তার ভক্তকে। এরপর নৃসিংহ রূপে, অর্থাৎ অর্ধমানব-অর্ধসিংহ রূপে; গোধূলি বেলায় যখন না রাত-না দিন; হিরণ্যকশিপুকে বাড়ির দোরগোড়ায়- যা না ঘরের বাইরে, না ভেতরে; নিজের কোলের ওপর নিয়ে, যা জলে-স্থলে-বায়ুতে কোনোখানেই নয়; হিরণ্যকশিপুর নাড়িভুঁড়ি বের করে, থাবা দিয়ে তাকে হত্যা করেন। এর ফলে হিরণ্যকশিপুর লাভ করা বর তাকে বাঁচাতে পারেনি। নিমেষেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। আর এ সবকিছুই ঘটলো ফাল্গুনী পূর্ণিমার ঠিক পূর্ব দিন।

এর মধ্য দিয়েই অশুভ শক্তির হার হলো এবং শুভশক্তির জয় এলো। এই দিনটিকে স্মরণ করতে ‘হোলিকা দহন’ বা ‘ন্যাড়াপোড়া’ উৎসব পালন করা হয় হোলির ঠিক আগের দিন। হোলিকার এই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার কাহিনীই দোলের পূর্বদিনে হোলিকাদহন নামে খ্যাত, যেটাকে বর্তমানে আমরা হোলি বলি।

কৃষ্ণ কথন ও দোল উৎসব

ভারতের ব্রজ অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণের বেড়ে ওঠা। কোনো এক বসন্তের পঞ্চম দিনে সেখানেই রাধা ও শ্রী কৃষ্ণের স্বর্গীয় ভালোবাসা রচিত হয়। তাই স্মৃতি হিসেবে দিনটি রঙ পঞ্চমী এবং প্রেমের উৎসব হিসেবে দিনটি উদযাপিত হয়।
আবার আরও একটি পুরাণ আছে রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে। ব্রজ অঞ্চলে হোলি কে ‘ফাগ্বাহ’ বলা হয় এবং এক্ষেত্রে হোলিকাদহনের হোলিকাকে বলা হয় ‘পুতনা’। কৃষ্ণের মামা, রাজা কংস তার শিশু ভাগ্নে কৃষ্ণকে নিজের জীবনের জন্য বিপদ বলে মনে করতেন। তাই কংস রাক্ষসী পুতনাকে নারীর বেশে কৃষ্ণকে হত্যা করতে নিয়োজিত করেন। তারা পরিকল্পনা করেন যে পুতনা রাক্ষসী কৃষ্ণকে স্তন্যপান করাতে গিয়ে বিষ প্রয়োগ করে কৃষ্ণকে মেরে ফেলবে। কিন্তু শিশু কৃষ্ণ রাক্ষসী পুতনার বিষাক্ত দুধ পান করে ফেললেও তার মৃত্যু হয় না, বরং বিষপানে তার গায়ের বর্ণ ঘন নীল হয়ে যায়, আর ওদিকে কাজ সম্পন্ন করেই পুতনা দ্রুত পালিয়ে যায় (মতান্তরে, পুতনার মৃত্যু ঘটে)।
হোলি বা ফাগ্বাহ উদযাপনের আগের রাতে পুতনার দহন উদযাপিত হয় ঠিক হোলিকাদহনের মতোই।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, কৃষ্ণ তার যৌবনে হতাশ ছিলেন নিজের শ্যাম বর্ণের কারণে। তিনি চিন্তিত ছিলেন যে উজ্জ্বল বর্ণের রাধা ও অন্যান্য গোপীরা তার এই বর্ণের কারণে তাকে অপছন্দ করবে এবং তার কাছে ঘেঁষবে না। পুত্রকে হতাশার হাত থেকে উদ্ধার করতে মা যশোদা পুত্রের গায়ে আবির ছুঁয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এবার এই আবির রাধার মুখে-গায়ে ছোঁয়াতে। এর ফলে কৃষ্ণ আর রাধাতে কোনো তফাত থাকবে না। কৃষ্ণও মায়ের আজ্ঞা পালন করেন, রাধার গায়ে আবির ছোঁয়ান এবং এরপরই তাদের মধ্যে প্রেম হয়। রাধা-কৃষ্ণের এই রঙ নিয়ে খেলাই হোলি বা দোলযাত্রা হিসেবে পালিত হয়।
তবে রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে হোলির যে বর্ণনাটি বেশি প্রচলিত, তা ভিন্ন। একদিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ, রাধা এবং তার সখীদের সাথে খেলা করছিলেন। এমন সময় রাধা এক বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। শ্রীকৃষ্ণ এ অবস্থা বুঝে রাধাকে সখীদের সামনে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আবির খেলা শুরু করেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি। বৈষ্ণব বিশ্বাসীদের কাছে এটাই দোল উৎসবের প্রধান কারণ। এ কারণে দোলযাত্রার দিন এ মতের বিশ্বাসীরা রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে রাঙিয়ে দোলায় চড়িয়ে নগর কীর্তনে বের হন। এ সময় পরস্পর তারা রং খেলে আনন্দে মেতে ওঠেন।
কথিত আছে, বসন্তের প্রথম পূর্ণিমায় ‘কেশি’ নামে এক অত্যাচারী অসুরকে বধ করেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। বসন্ত পূর্ণিমায় আসুরিক শক্তির বিনাশের আনন্দে শ্রীকৃষ্ণ দানবের রক্ত ছিটিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। সেই আনন্দে সামিল হন ব্রজবাসীও। তার হাত ধরেই সূচনা হয় হোলি উৎসবের।
আবার আর এক মতে, ‘অরিষ্টাসুর’ নামের এক অসুর বধের আনন্দেই নাকি শ্রীকৃষ্ণের সাথে মৃত দৈত্যের রক্ত নিয়ে উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিলেন ব্রজধামের বাসিন্দারা। সেই রক্তরাঙ্গা রঙের উৎসব থেকেই প্রবর্তন হয় দোল বা হোলি মহোৎসবের।
দোল বা হোলি, যে নামেই তাকে ডাকা হোক, ফাগের মিষ্টি সুবাসে তা চিরন্তন প্রেমের দোলা দিয়ে যায় মনে। সেই প্রেম কখনও মননের, কখনও বা শরীরী। সেই প্রেম আদি অনন্ত। গোপিনী শ্রেষ্ঠা রাই ও গোপ শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের অনুরাগের রঙে সেই প্রেম দ্বাপরে ধারণ করেছিল মনোহর কায়া। রাধা ও কৃষ্ণের যুগললীলায় দোল আজ পেয়েছে এক বিশ্বজনীন রূপ।
নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তে পলাশের আবীর মাখা রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন। জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!

নব বসন্তের কবিতা – ১ হোলির গান
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
আজকে হোলি খেলবো হোলি
আজকে সবার সাথে,
আবীর রঙে মন রাঙিয়ে
নাচবো আঙিনাতে।
পলাশ বনে ফুল ফুটেছে
কোকিল গাহে গান,
আজকে হোলি পুলক জাগে
উঠুক মেতে প্রাণ।
আজকে জানি দোল পূর্ণিমা
হোলি খেলার দিন,
ফাগুন রঙে প্রভাত বেলা
হলো আজ রঙিন।
মেতেছে আজ হোলি খেলায়
ছোটো বড়ো সবাই,
খেলছে হোলি সবাই মিলে
রং লাগিয়ে গায়।
হোলির দিনে কাঁদছে কেন
ছোট্ট খোকন সোনা,
দেয়নি কিনে পিচকারি রং
খেলতে হোলি মানা।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি- ২
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের রঙ। বসন্তকে বরণ করে নিতে তাই প্রকৃতির রঙে রঙ মিলিয়ে সবাই মেতে ওঠে উৎসবে। ‘ফুল ফুটুক-আর নাই বা ফুটুক-আজ বসন্ত।’ বাঙালির প্রিয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বসন্তকে প্রতিভাত করে গেছেন এই একটি বাক্যেই।
বসন্ত আজ এসেছে ফুলবনে, পাতায় পাতায় পল্লবে, পল্লবে। ডালে ডালে পলাশ, শিমুল আর বকুলের সৌরভে শীতের ঝড়া পাতার মর্মরে মর্মরে আজ থেকে ধ্বনিত হবে বসন্তের কোকিলের কহু কহু তান। পৌষ আর মাঘের শীতার্ত দিনগুলোর পরে ফ্লাগুন মাসের প্রথম দিনে বাঙালি বরণ করে নেবে তাদের প্রিয় বসন্তকে।
‘আজি নব বসন্তের প্রভাতের লেশমাত্র ভাগ আনন্দের / লেশমাত্র ভাগ, আজিকার কোনো ফুল/ বিহঙ্গের কোনো গান/ আজিকার কোনো রক্তরাগ/ অনুরাগে সিক্ত করি পারিবো কি পাঠাইতে তোমাদের তরে!’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালি জাতির কাছে বসন্তের প্রথম দিনটিকে এভাবেই সম্বোধন করে গেছেন আজ থেকে এক শ’ বছর আগে।
আজ বেজে উঠবে সুরে সুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গান‘ফুলে ফুলে দুলে দুলে বহে কে বা মৃদু বায়ে/ কে জানে কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়।’ রেকর্ডে বেজে উঠবে লতা মুঙ্গেশকরের সেই গান-‘পাখি আজ কোন সুরে গায়/ কোকিলের ঘুম ভেঙে যায়/ আজ কোনো কথা নয়/ শুধু গান/ আরো গান/ আজ বুঝি দু’জনের মন/ কতো সুরে করে আলাপন/ আজ কোনো কথা নয়/ শুধু গান আরো গান…।’
বসন্ত যে যৌবন এ কথা বোঝা যায় পংকজ কুমার মল্লিকের গাওয়া- ‘চৈত্র দিনের ঝরা পাতার পথে দিনগুলো মোর কোথায় গেলো’ কিংবা সত্য চৌধুরীর গাওয়া – ‘তোমার সে ডাকে ঝরা ফুল শাখে ফাগুণ আসিবে ফিরে/ মনে হবে কার প্রেম জেগে রয়…. যেথা গান থেমে যায় ………’ গানের কথাগুলো শুনলে। বসন্তে প্রিয়তমা’র মনে উঁকি দেয়- ‘তুমি বিনা এ ফাগুন বিফলে যায় ‘ কিংবা ‘ আমি তোমারে ভুলি নাই ভুলি নাই প্রিয়া ……….. মনে পড়ে সেই বন জ্যোস্নায় দেখা হয়েছিলো তোমায় আমায় …………’। যিনি যৌবন হারিয়েছেন তিনি যদি মনে করেন -‘ ওগো তাই এই মন যদি বসন্তের গানে ভরে / তবে তোমার কথাই মনে পড়ে/ ওগো তুমি যে হৃদয়ে দাও সাড়া …..’ গানের এই কথাগুলো, তাহলে অতীতের সেই নানা রংয়ের দিনগুলো চোখের পাতায় আবারও ভেসে উঠবে। বসন্ত, যৌবন আর ভালোবাসা যেন এক হয়ে আছে। এই ভালোবাসা মুক্ত বিহঙ্গের মতো এই বিশ্বের চরাচরে, মানুষের হৃদয়ে, প্রকৃতির পরতে পরতে এর অবাধ বিচরণ। ভালোবাসা আমাদের কে শিখায় যুদ্ধ- বিগ্রহ, খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাস আর প্রতিহিংসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আর এটাও এক ধরনের ভালোবাসা বা প্রেম। যারা মানবতার শত্রু তাদেরকে বুকে আলিঙ্গন করে নেয়াও এক ধরনের ভালোবাসা । বসন্ত মানেই ভালোবাসা আর এই ভালোবাসা আমাদেরকে দেখায় সুখী সুন্দর শান্তিপূর্ণ এক স্বপ্ন।

বসন্তকালকে নিয়ে গান ও কবিতায় ভরে দিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতুরাজ বসন্ত এলে তাই মনে পড়বেই – ‘ নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগল, বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল’; ‘ বসন্ত তার গান লিখে যায় ধূলির পরে কী আদরে/ তাই সে ধূলা ওঠে হেসে বারে বারে নবীন বেশে’ ; ‘সেই তো বসন্ত ফিরে এল, হৃদয়ের বসন্ত ফুরায় হায়রে’; ‘ ফাল্গুন হাওয়ায় রঙে রঙে পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে/ গোলাপ জবা পারুল পলাশ পারিজাতের বুকের পরে’; ‘ ফাল্গুনের পূর্ণিমা এলো কার লিপি হাতে’ ; ‘ বসন্তে আজ ধরার চিত্ত হলো উতলা, বুকের পরে দোলে দোলে দোলে রে তার পরান পুতলা’; ‘ বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা/ বইল প্রাণে দক্ষিণ – হাওয়া আগুন জ্বালা’ ; ‘ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে- ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে’;’ মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে’;’রোদন ভরা এ বসন্ত সখী কখনও আসেনি বুঝি আগে’- ইত্যাদি।

ফাল্গুন এলেই শুরু হয় বসন্তকাল আর এই ফাল্গুনকে নিয়েই কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর গানে দু’টি চরণ হলো- ‘ও মা , ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে ‘। বসন্তের দিনে কোনো এক কবরস্থানে নয়তো শ্মশান ঘাটে ঢুকে পড়লে মনে পড়বেই লোকান্তরিত প্রিয় মানুষদের মুখখানি। এ জন্য শোকে বিহবল হয় পড়বেন কখনো বা। কৃষ্ণচূড়া তলে কোনো কবর কিংবা সমাধি দেখে হয়তো ভাববেন, এ কী কোনো ব্যর্থ প্রেমিকের সমাধি। আহা কতো ফুল ছড়িয়ে রয়েছে সমাধিতে। নিজ হাতে ফুল ছিটিয়ে দিতে গিয়ে মনে পড়বে-‘ সমাধিতে মোর ফুল ছড়াতে কে গো এলে, সমাধিতে মোর ………. কতবার গিয়ে তব দ্বারে হায় ……….. মনে করো ভিখারি আমারে, ভিক্ষা নাহি দিলে তুমি ফিরায়েছো যারে………’ গানের এই কথাগুলো। তখনতো স্মৃতিতে জাগবে এই গানের অমর শিল্পী গৌরী কেদার ভট্টাচার্য্যের কথা। চট্টগ্রামের সন্তান এই গৌরীকেদার ভট্টাচার্য্য ১৯৪০ সালে ‘নিমাই সন্ন্যাস’ ছবিতে বাউল সাজেন। শেষ জীবনে তিনি তো যোগী হয়ে মন্দিরে মন্দিরে গান গাইতেন – তখন ও তার মনে ছিল বসন্ত। তিনি তো চির বসন্তের কন্ঠ শিল্পী। ফাল্গুন – চৈত্র নিয়ে এই বসন্তকাল তো প্রেমিক – প্রেমিকার মন দেয়া – নেয়ার ঋতু ক্ষণ, তাইতো ওদের মনে উঁকি দেয়- ‘আজ একটি গানের বীণা বাজবে বাজবে দু’টি প্রাণে/ মোর অনেক দিনের আশা আমি বলবো গানে গানে / ফাগুন হাওয়ার মতো আমি বলবো তোমার কানে কানে……….’ চির বসন্তের গানের এই চরণগুলি। ‘তুমি আর আমি’ ছবিতে কানন দেবী গেয়েছিলেন- ‘ফাগুনের উতরোল কী হাওয়া লাগলো / বাতায়নে নিরজনে মুকুলটি জাগলো…. কৃষ্ণচূড়ার বনে কোকিল কী ডাকলো …’; ‘বসন্ত আজ রাঙিয়ে দিল গানে / এই জনমের প্রথম ভালোবাসা’ আর ‘শত বসন্ত মোদের মিলন রাগে/গোলাপের বুকে বিহগীর মুখে জাগে’- গানের এই চরণগুলি জানিয়ে দেয় বসন্ত আর ভালোবাসা যেনো একই বন্ধনে বাঁধা।
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা- ২
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্তের রং মাখে
কিশলয় তরুশাখে
পবন পরশে দোলে হাওয়ায়।

আমবনে থেকে থেকে
কোকিল উঠিল ডেকে
তরুর শাখায় পাখি গীত গায়।
অজয়ের বালুচরে
সোনা রোদ পড়ে ঝরে
শাল পিয়ালের বনে বাঁশি বাজে,
হৃদয়ে পুলক জাগে
দেহে মনে রং লাগে
প্রকৃতি সাজিছে নব রূপ সাজে।
ফুলবনে ফুল ফুটে
পূবদিকে রবি উঠে
অলিগণ চলে ধেয়ে পুঞ্জে পুঞ্জে,
কোকিলের কুহুতান
ভরে উঠে মন প্রাণ
ডাকিছে কোকিল সুরে আম্রকুঞ্জে।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৩
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- নব বসন্তের দানের ডালি এনেছি তোদেরই দ্বারে, আয় আয় আয়, পরিবি গলার হারে॥ লতার বাঁধন হারায়ে মাধবী মরিছে কেঁদে– বেণীর বাঁধনে রাখিবি বেঁধে, অলকদোলায় দুলাবি তারে, আয় আয় আয়।
ফুলের উচ্ছ্বাসে হাসছে আকাশ, কাঁপছে বাতাস, দুলছে আম্রমুকুল। অকারণের সুখে অলক্ষ্যে রঙ লাগছে অশোকে-কিংশুকে। মেঠোপথের ধারে কারও জন্য অপেক্ষা না করেই ফুটছে নাম না-জানা অসংখ্য সব ফুলেরা। তরুণ মনে বিহ্বলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে কোকিলের ডাক।
সে সুরের আবেগে প্রকৃতিতে বসন্তের রঙ লেগেছে ক’দিন ধরেই- তবে দিনপঞ্জির হিসাবে তার অভিষেক আজকের নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে।

ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবের রঙে মেতে ওঠে তরুণ হৃদয়, নতুন করে প্রাণ পান প্রবীণেরা। বসন্তে শুধু প্রকৃতিই নয়, হৃদয়ও রাঙা হয়ে ওঠে। বসন্ত তাই অনেকের কাছে ‘প্রেমের ঋতু’। সে ঋতুতে চোখে নেশা লাগে, দিক ভুল হয়; বাসনা বিলাসে বাড়ে আশা, বৃদ্ধি পায় মনের সুপ্ত তিয়াশা।
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা – ৩
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত এলো রে
এই ধরা পরে
শিমূল পলাশ বনে,

এসেছে ফাগুন,
ধরেছে আাগুন
রং লাগে দেহে মনে।

এসেছে ফাগুন
ধরেছে আগুন
এলো রে বসন্ত আজি,

পবন পরশে
মনের হরষে
দুলিছে কুসুম রাজি।

আম্র তরুশাখে
কোকিলেরা ডাকে
ভরে ওঠে মন প্রাণ,

কুসুম কাননে
ধায় অলিগণে
গুঞ্জরিয়া অবিরাম।

অজয়ের চরে
সোনা রোদ ঝরে
বসন্তে গাহিছে পাখি,

ফুলের কাননে,
ধায় অলিগণে,
বসন্তের রং মাখি।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৪
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
ফুলের উচ্ছ্বাসে হাসছে আকাশ, কাঁপছে বাতাস, দুলছে আম্রমুকুল। অকারণের সুখে অলক্ষ্যে রঙ লাগছে অশোকে-কিংশুকে। মেঠোপথের ধারে কারও জন্য অপেক্ষা না করেই ফুটছে নাম না-জানা অসংখ্য সব ফুলেরা। তরুণ মনে বিহ্বলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে কোকিলের ডাক।
সে সুরের আবেগে প্রকৃতিতে বসন্তের রঙ লেগেছে ক’দিন ধরেই- তবে দিনপঞ্জির হিসাবে তার অভিষেক আজকের নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে।

ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবের রঙে মেতে ওঠে তরুণ হৃদয়, নতুন করে প্রাণ পান প্রবীণেরা। বসন্তে শুধু প্রকৃতিই নয়, হৃদয়ও রাঙা হয়ে ওঠে। বসন্ত তাই অনেকের কাছে ‘প্রেমের ঋতু’। সে ঋতুতে চোখে নেশা লাগে, দিক ভুল হয়; বাসনা বিলাসে বাড়ে আশা, বৃদ্ধি পায় মনের সুপ্ত তিয়াশা।
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা – ৪
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত আসিল আজি
ফুটে ফুল রাশি রাশি
পাখি গীত গায় তরুশাখে,
বাতাসে সৌরভ ছুটে
ফুলবনে ফুল ফুটে,
বসন্তে কোকিল কুহু ডাকে।
বসন্তের রং লাগে,
হৃদয়ে পুলক জাগে
আবেশিত হয় তনু মন,
বসন্ত ঋতুর রাজা
বসন্তে বাসন্তী পূজা
পূর্ণিমায় হোলির দহন।
রাঙাপথে দুই ধারে
তালগাছ সারে সারে
সবুজ ডাঙায় গাভী চরে,

সোনাঝরা রোদদুরে
রাখালিয়া বাঁশি সুরে
মোর পরাণ পাগল করে।

বসন্তের রং মাখে
শিমূল পলাশ শাখে
ফুলে ফুলে শোভা মনোহর,

অজয় নদীর ঘাটে
অবশেষে বেলা কাটে
সন্ধ্যা নামে অজয়ের চর।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৫
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

বসন্ত এসে গেছে। প্রকৃতি সেজে উঠছে নানা রঙে। ঋতুরাজের আগমনে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের রঙ। বসন্তকে বরণ করে নিতে তাই প্রকৃতির রঙে রঙ মিলিয়ে সবাই মেতে ওঠে উৎসবে। আর গান ছাড়া তো উৎসব একেবারেই ম্লান। তাই বসন্তকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গান।

গাছে গাছে ইতিমধ্যেই শিমূল, পলাশে রঙ ধরতে শুরু করেছে। রঙ ধরতে শুরু করেছে মানুষের মনেও। বসন্ত মানেই তো রঙের আবাহন। শীত শেষে বসন্তের আগমন মনে অন্য এক দোলা দিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার পয়লা ফাল্গুন। বসন্তের শুরু। আকাশ বাতাসও বলছে বসন্তে এসে গেছে। তাও আবার এমন একটা দিনে যেদিন প্রেমের দিন। ভালবাসার দিন। প্রেমের দিনে বসন্তের আগমন। এ তো রাজযোটক। ভ্যালেন্টাইনস ডে কে সামনে রেখে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই তারুণ্যের জোয়ার। প্রেমের জোয়ার।

মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!

নব বসন্তের কবিতা – ৫
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
ফাল্গুনে ফুল ফোটে
পাখি গায় গীত,
বসন্ত এলো ভাই
নাই আজ শীত।
শিমূল পলাশ বনে
ফুটে ফুল কলি,
গুঞ্জরিয়া আসে তাই
পুঞ্জে পুঞ্জে অলি।
নব নব কিশলয়
হেরি তরুশাখে,
আমবনে কোকিলেরা
কুহু স্বরে ডাকে।
রাঙাপথ এসে মিশে
অজয়ের ঘাটে,
দিবসের অবসানে
সূর্য বসে পাটে।

নদীবাঁকে শেয়ালেরা
করে হাঁকাহাঁকি,
রাত কাটে ভোর হয়
ডেকে উঠে পাখি।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৬
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
ফুলের উচ্ছ্বাসে হাসছে আকাশ, কাঁপছে বাতাস, দুলছে আম্রমুকুল। অকারণের সুখে অলক্ষ্যে রঙ লাগছে অশোকে-কিংশুকে। মেঠোপথের ধারে কারও জন্য অপেক্ষা না করেই ফুটছে নাম না-জানা অসংখ্য সব ফুলেরা। তরুণ মনে বিহ্বলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে কোকিলের ডাক।
সে সুরের আবেগে প্রকৃতিতে বসন্তের রঙ লেগেছে ক’দিন ধরেই- তবে দিনপঞ্জির হিসাবে তার অভিষেক আজকের নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে।

ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবের রঙে মেতে ওঠে তরুণ হৃদয়, নতুন করে প্রাণ পান প্রবীণেরা। বসন্তে শুধু প্রকৃতিই নয়, হৃদয়ও রাঙা হয়ে ওঠে। বসন্ত তাই অনেকের কাছে ‘প্রেমের ঋতু’। সে ঋতুতে চোখে নেশা লাগে, দিক ভুল হয়; বাসনা বিলাসে বাড়ে আশা, বৃদ্ধি পায় মনের সুপ্ত তিয়াশা।
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা – ৬
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

ফুলবনে ফুল ফুটে
পূবদিকে রবি উঠে
পাখি গীত গায় তরুশাখে,

ফুলবনে ফুটে কলি
আসে ধেয়ে যত অলি
বসন্তে কোকিল সুরে ডাকে।

রাঙাপথে দুই ধারে
তালগাছ সারে সারে
সবুজ ডাঙায় গাভী চরে,

সোনাঝরা রোদদুরে
রাখালিয়া বাঁশি সুরে
মোর পরাণ পাগল করে।

বসন্তের রং মাখে
শিমূল পলাশ শাখে
ফুলে ফুলে শোভা মনোহর,

অজয় নদীর ঘাটে
অবশেষে বেলা কাটে
সন্ধ্যা নামে অজয়ের চর।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৭
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত এসে গেছে। প্রকৃতি সেজে উঠছে নানা রঙে। ঋতুরাজের আগমনে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের রঙ। বসন্তকে বরণ করে নিতে তাই প্রকৃতির রঙে রঙ মিলিয়ে সবাই মেতে ওঠে উৎসবে। আর গান ছাড়া তো উৎসব একেবারেই ম্লান। তাই বসন্তকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গান।
গাছে গাছে ইতিমধ্যেই শিমূল, পলাশে রঙ ধরতে শুরু করেছে। রঙ ধরতে শুরু করেছে মানুষের মনেও। বসন্ত মানেই তো রঙের আবাহন। শীত শেষে বসন্তের আগমন মনে অন্য এক দোলা দিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার পয়লা ফাল্গুন। বসন্তের শুরু। আকাশ বাতাসও বলছে বসন্তে এসে গেছে। তাও আবার এমন একটা দিনে যেদিন প্রেমের দিন। ভালবাসার দিন। প্রেমের দিনে বসন্তের আগমন। এ তো রাজযোটক। ভ্যালেন্টাইনস ডে কে সামনে রেখে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই তারুণ্যের জোয়ার। প্রেমের জোয়ার।
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!

নব বসন্তের কবিতা – ৭
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত আসিল আজি
ফুটে ফুল রাশি রাশি
পাখি গীত গায় তরুশাখে,

বাতাসে সৌরভ ছুটে
ফুলবনে ফুল ফুটে,
বসন্তে কোকিল কুহু ডাকে।
কাননে ফুটিল কলি
গুঞ্জরিয়া আসে অলি
পূবেতে উঠিছে রাঙা রবি,

শিমূল পলাশ বনে,
রং লাগে দেহে মনে
হেরি নব বসন্তের ছবি।

বসন্তের রং লাগে,
হৃদয়ে পুলক জাগে
আবেশিত হয় তনু মন,

বসন্ত ঋতুর রাজা
বসন্তে বাসন্তী পূজা
পূর্ণিমায় হোলির দহন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব
”ওরে গৃহবাসী
খোল্‌, দ্বার খোল্‌, লাগল যে দোল।
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।
দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌।।
রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে
রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে
নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।
দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌।।
বেণুবন মর্মরে দখিন বাতাসে
প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে।
মৌমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিন
পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা
মাধবীবিতানে বায়ু গন্ধে বিভোল।
দ্বার খোল্‌, দ্বার খোল্‌।।”
রাঙা আকাশ, অশোক পলাশ ফুল আর মৌমাছ প্রজাপতির ওড়াওড়ি জানান দেয় বসন্তের আগমনের। সাথে উৎসবের আমেজ যোগ করে দেয় দোলযাত্রা। তাই আর ঘরে থাকা যায় কি? এমন আনন্দঘন দিনে একে অন্যের সাথে সোহাগ-সম্প্রীতি গড়ে তুলবে, এই তো স্বাভাবিক। তাই রবীন্দ্রনাথ গানের কথায় ডাক দিচ্ছেন গৃহবাসীদের এই সৌন্দর্য অবলোকনের, এই দোল উৎসব পালনের। গানের কথায় স্পষ্ট দোলের বৈশিষ্ট্য এবং বসন্তের আগমনী বার্তা।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরে অবস্থিত শান্তিনিকেতন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনের দ্বিতীয়ার্ধের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত এই শান্তিনিকেতনের আশ্রমে। এখানে বসেই বিশ্বকবি তার অসংখ্য সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে গেছেন। প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনে নাচ-গান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হতো বসন্তকে। পরপবর্তীতে দোলযাত্রা যেহেতু বসন্তে উদযাপিত হয়, তাই দোল ও বসন্তবরণ একইসাথে বসন্তোৎসব হিসেবে ধুমধাম করে উদযাপন করা শুরু হলো শান্তিনিকেতনে। ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উদ্বোধন করে যান এই উৎসবের। এছাড়া দোলের পূর্ব রাতে হোলিকাদহনের মতোই ‘বহ্নি উৎসব’ পালন করা হয়।
বর্তমানে রবীন্দ্রনাথের ‘ওরে গৃহবাসী’ গানের মাধ্যমেই সূচনা হয় বসন্তোৎসবের এবং দিনভর চলে রঙ খেলা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
শ্রী চৈতন্য দেব ও গৌড়পূর্ণিমা
ফাল্গুনের এই পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রী চৈতন্য দেবের জন্ম হয়, তাই একে গৌড়পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। তাই বৈষ্ণব সমাজে দোলের সাথে সাথে গৌড়পূর্ণিমাও বিশেষ তাৎপর্যের সাথে পালিত হয়।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬– ১৫৩৪) পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী এবং ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক। তিনি মূলত রাধা ও কৃষ্ণ রূপে ঈশ্বরের পূজা প্রচার করতেন। ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রটি তিনিই জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।
কামদেবের প্রত্যাবর্তনে রঙ খেলা
বৈষ্ণবধর্ম ছাড়া শৈব ও শাক্তধর্মেও হোলি উৎসবের রেওয়াজ ছিল। হোলি নিয়ে শিব ও কামদেবের একটি গল্পও প্রচলিত আছে। শিব ছিলেন কঠিন ধ্যানে মগ্ন। তার ধ্যান ভাঙতে এবং স্বামীরূপে শিবকে পাওয়ার জন্য বসন্ত পঞ্চমীর দিন পার্বতী প্রেমের দেবতা কামদেব এবং প্রেমের দেবী রতির সাহায্য প্রার্থনা করেন। কামদেব এবং তার স্ত্রী রতি পার্বতীকে সাহায্য করবেন বলে ঠিক করেন। কিন্তু শিব তখন যোগাসনে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে আছেন। এই ধ্যান ভাঙা খুব কঠিন! কিন্তু পার্বতীর কথা ভেবে কামদেব ও রতি শিবের দিকে তীর ছোঁড়েন। ধ্যানে এই বিঘ্ন ঘটবার কারণে শিব তার তৃতীয় চক্ষু খোলেন এবং সেই চক্ষুর তেজোদ্দীপ্ত চাহনিতে কামদেব দগ্ধ হয়ে ছাইয়ে পরিণত হন। স্বামী হারিয়ে রতি কষ্টে ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে শিব পার্বতীকে বিয়ে না করে, রতির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহের একপর্যায়ে রতি শিবের কাছে তার স্বামীর প্রাণভিক্ষা চান। শিব সম্মত হয়ে কামদেবকে ফিরিয়ে দেন কিন্তু একটু ভিন্নভাবে তার অবতার হয়।
প্রেমের দেবতার এই ফিরে আসাকে বসন্ত পঞ্চমী উৎসবের চল্লিশ দিন পর হোলি উদযাপিত হয়। দক্ষিণ ভারতে এই কাহিনী অনুসরণ করেই রঙ খেলা পালন করতে দেখা যায়।
দোল উৎসব যেমন প্রাচীন, তেমনই প্রধান একটি উৎসব হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে। হিন্দু অধ্যুষিত যেকোনো স্থানেই বড় পরিসরে রঙ খেলা হয়ে থাকে। তাই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এর হরেক নাম লক্ষ্য করা যায়। যেমন- গুজরাটে ধুলেতি, উত্তর প্রদেশে লাঠ মার হোলি, উত্তরখণ্ডে কুমায়নি হোলি, বিহারে ফাগুয়া, ওড়িশায় দোলা, গোয়ায় শিগমো, মণিপুরে ইয়াওসাং, কেরালায় উক্কুলি এবং নেপালে ফাগু।
প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও দোল বা হোলির তাৎপর্য লক্ষ্যণীয়। লিঙ্গ ও ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষই সামিল হতে পারে এই আনন্দঘন উৎসবে। যে কাউকেই রঙ খেলার মতো অন্যতম উৎসবটি আকৃষ্ট করবে। তাই এই সময়ে দেখা যায় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। যেকোনো প্রকার বৈষম্য ভুলে নিরপেক্ষভাবে রঙে, গানে, নতুনে মেতে ওঠে সকলে।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ৮
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
চঞ্চল মনের আবেগের বিহ্বলতায় ছড়িয়ে প্রতি বছর বসন্ত আসে ভালবাসার ডাক ছড়িয়ে দেওয়া কোকিলের কুহুতানে। এরই মধ্যে প্রকৃতিতে বসন্তের রং লেগেছে, তবে দিনপঞ্জির হিসেবে তার অভিষেক আজকের নতুন সূর্যের পিছু ধরে।
বাংলার নিসর্গ প্রকৃতিতে লেগেছে ফাগুনের হাওয়া। ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে সবুজ প্রান্তর। তীব্রভাবে মনের মধ্যে আকুতি ছড়িয়ে দিচ্ছে যেন রবীন্দ্রনাথের গান— ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/আমার আপনহারা প্রাণ/আমার বাঁধনছেঁড়া প্রাণ/তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/তোমাকে অশোকে-কিংশুকে/অলক্ষ্যে রং লাগল আমার অকারণে সুখ…।’
ঋতুরাজ বসন্ত বাঙালি আর বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নিয়ে আসে প্রেম ও বিদ্রোহের যুগল আবাহন। এমনই এক বসন্তে ব্রিটিশ সাম্যরাজ্যবাদীরা কারাগারে ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের কারণে দেশদ্রোহের অভিযোগে আটকে রেখেছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ‘বসন্ত’ নামক গ্রন্থটি তাকে উৎসর্গ করে প্রকাশের মাধ্যমে নজরুলের সঙ্গে নিজের একাত্ম প্রকাশ করেছিলেন।
মহান গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব অসহযোগ আন্দোলনও দানা বেঁধেছিল বসন্ত ঋতুতে। স্বাধীন বাংলাদেশেও গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বার বার পথ খুঁজে পেয়েছে বসন্তকালে। বসন্ত তাই বাঙালির জীবনে বাঁধনহারা হয়ে সৃষ্টির উল্লাসে প্রেমের তরঙ্গে ভাসার সময়। তাই নজরুলের কলম থেকে বেরিয়ে আসে, ‘এল খুনমাখা তূণ নিয়ে/খুনেরা ফাগুন …।’ রবিঠাকুরও লেখেন, ‘হাসির আঘাতে তার/মৌন রহে না আর,/কেঁপে কেঁপে ওঠে খনে খনে।’
মায়াময় বসন্ত সবাইকে কেড়ে নেয় নিজের ভালবাসার মোহে। যেন প্রেমিকা তার প্রেমিককে মায়া বন্ধনী দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি নব ফাগুন সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন।
জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা – ৮
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
শীত হল অন্ত আসিল বসন্ত
বসন্তের আগমন,
আম্র তরুশাখে কোকিলেরা ডাকে
প্রাণ মন উচাটন।
রাঙাপথ বাঁকে আম্র তরুশাখে
কোকিলের কুহু স্বর,
কুসুম কাননে মধু আহরণে
ধেয়ে আসে মধুকর।
অজয়ের চরে পাখা মেলে উড়ে
আসে বলাকার সারি,
রাঙাপথ ধরে ছুটিছে মন্থরে
গ্রামের গরুর গাড়ি।
পলাশের বনে রং লাগে মনে
আসে শালিকের দল,
সারাদিন ধরে ওরা খেলা করে
করে কত কোলাহল।
দিবা অবসানে পশ্চিমের পানে
সূর্য যবে অস্ত যায়,
তুলসীর তলে ধূপদীপ জ্বলে
বধূরা শঙ্খ বাজায়।
সাঁঝের সানাই বেজে উঠে দূরে
সাঁঝ নামে মোর গাঁয়,
রাতের আকাশে চাঁদ তারা হাসে
ফুটফুটে জোছনায়।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি -৯
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবের রঙে মেতে ওঠে তরুণ হৃদয়, নতুন করে প্রাণ পান প্রবীণেরা। বসন্তে শুধু প্রকৃতিই নয়, হৃদয়ও রাঙা হয়ে ওঠে। বসন্ত তাই অনেকের কাছে ‘প্রেমের ঋতু’। চঞ্চল মনের আবেগের বিহ্বলতায় ছড়িয়ে প্রতি বছর বসন্ত আসে ভালবাসার ডাক ছড়িয়ে দেওয়া কোকিলের কুহুতানে।
গাছে গাছে ইতিমধ্যেই শিমূল, পলাশে রঙ ধরতে শুরু করেছে। রঙ ধরতে শুরু করেছে মানুষের মনেও। বসন্ত মানেই তো রঙের আবাহন। শীত শেষে বসন্তের আগমন মনে অন্য এক দোলা দিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার পয়লা ফাল্গুন। বসন্তের শুরু। আকাশ বাতাসও বলছে বসন্তে এসে গেছে। তাও আবার এমন একটা দিনে যেদিন প্রেমের দিন। ভালবাসার দিন। প্রেমের দিনে বসন্তের আগমন। এ তো রাজযোটক। ভ্যালেন্টাইনস ডে কে সামনে রেখে শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই তারুণ্যের জোয়ার। প্রেমের জোয়ার।
বসন্ত এসে গেছে। প্রকৃতি সেজে উঠছে নানা রঙে। ঋতুরাজের আগমনে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের রঙ। বসন্তকে বরণ করে নিতে তাই প্রকৃতির রঙে রঙ মিলিয়ে সবাই মেতে ওঠে উৎসবে। আর গান ছাড়া তো উৎসব একেবারেই ম্লান। তাই বসন্তকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গান।
বসন্ত হলো প্রেমের ঋতু। প্রেমের বার্তা নিয়েই যেন আগমন ঘটে ঋতুরাজের। বাঙালির মনন আলোড়িত করা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, অতুলপ্রসাদ, জসীমউদ্্দীন, শাহ আবদুল করিমের অমূল্য সৃষ্টিসম্ভারের অনুষঙ্গ সমৃদ্ধ করে এই আয়োজনকে। তবে প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কবিরা বসন্তের প্রভাব তুলে ধরেছেন তাদের রচিত অমর পঙ্ক্তিমালায়। এ ঋতুটাকে বাংলার কবি সম্প্রদায় জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন বোধহয় একটু বেশি গুরুত্ব দিয়েই। মধ্যযুগের কবি বড়–-চ-ীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন যা বাংলা ভাষার দ্বিতীয় নিদর্শন; এই কাব্যগ্রন্থটিতেই আমরা বসন্তের প্রভাব লক্ষ করি দারুণভাবে।
মধ্যযুগের অন্যতম কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী। বাংলা সাহিত্যে সবল চরিত্র রূপায়ণে তিনি স্বকীয়তার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার নির্মিত অন্যতম চরিত্র নায়িকা ফুল্লরাও বসন্তের আবেদন উপেক্ষা করতে পারেনি : সহজে শীতল ঋতু ফাল্গুন যে মাসে।/ পোড়ায় রমণীগণ বসন্ত বাতাসে। [ফুল্লুরার বারো মাসের দুঃখ : কালকেতুর উপাখ্যান]
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তও বসন্তের আবেগে নিজেকে জড়িয়েছেন। তিনিও বসন্তের পাখপাখালির কলরবে মুখরিত হয়েছেন। বসন্তের রঙে নিজের অন্তরকে রাঙিয়েছেন বাংলা ভাষার এ অমর শিল্পস্রষ্টা :
নহ তুমি পিক, পাখি, বিখ্যাত ভারতে,/ মাধবের বার্তাবহ; যার কুহরণে/ ফোটে কোটি ফুল্লুপুঞ্জ মঞ্জু কুঞ্জবনে!-/ তবুও সঙ্গীত-রঙ্গ করিছ যে মতে/ গায়ক, পুলক তাহে জনমে এ মনে! [বসন্তের একটি পাখির প্রতি : চতুর্দশপদী কবিতাবলি]

নব বসন্ত সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন। জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!
নব বসন্তের কবিতা-৯
কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত এসেছে প্রকৃতি হেসেছে
নব নব কিশলয়,
রাঙাপথ বাঁকে হেরি তরুশাখে
পত্র পল্লবিত হয়।
তরুশাখে পাখি গাহে না একাকী
খুঁজে ফিরে সহচরী,
কুসুম কাননে হরষিত মনে
গুঞ্জন করে ভ্রমরী।
বসন্ত এলো রে এ ধরার পরে
সাজিছে পলাশ বন।
কিংশুক কলি ফুটিল সকলি
রেঙে উঠে তনু মন।
অজয়ের বাঁকে আম্র তরুশাখে
গাহিছে কোকিলা সুরে,
শুনি কান পাতি বংশীর ধ্বনি
বাজে রাখালিয়া সুরে।

দিবা অবসানে পশ্চিমের পানে
লাজে মুখ ঢাকে রবি,
সুরের আকাশে জোছনায় ভাসে
নব বসন্তের ছবি।

বসন্তে রং লাগে মনে….. পুলক জাগে হৃদয়ে
বসন্ত আসিল আজি – ১০
তথ্যসংগ্রহ ও কলমে- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
পৃথিবীজুড়ে এখন তুমুল বসন্ত। দেশে দেশে চলছে বসন্তবরণ। চীন দেশে শীত শেষে যেমন বসন্ত আসে, তেমনি আসে চীনা নববর্ষ! বসন্ত আর নতুন বছরের আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় চীনাদের জীবনে। এই উৎসবকে স্থানীয় ভাষায় পিনয়নি কিংবা চুনয়িন বলা হয়। জাপানে বসন্ত খুব সহজেই নজর কাড়ে। পুরো দেশটাই যেন ছেয়ে যায় চেরি ফুলে। এই ফুল ফোটার উৎসবে গা ভাসানো শুরু করে জাপানিরা। এই উৎসবকে বলা হয় হানামি। ইউরোপে সবচেয়ে জমজমাটভাবে বসন্ত উদযাপিত হয় স্পেনে। উৎসবটির নাম লাস ফালেস। এ ছাড়া, আয়ারল্যাণ্ড, রোমানিয়া, ইতালি ও ক্রোয়েশিয়ায় সাজসাজ রবে উদযাপন করা হয় এই উৎসব। কিন্তু অন্যান্য দেশের তুলনায় যে দেশে সবচেয়ে উৎসবমুখর বসন্তবন্দনা হয় তার নাম বাংলাদেশ। ১লা ফাল্গুন সারাদেশ যেভাবে হলুদ পোশাক ও বিভিন্ন ফুলের সজ্জায় নিজেকে সাজিয়ে এই উৎসবের সূচনা করে তা অভিনব।
এই উৎসবের সঙ্গে ১৯৫২ সালের ৮ই ফাল্গুন বা একুশে ফেব্রুয়ারির পলাশরাঙা দিনের সঙ্গে তারুণ্যের সাহসী উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা আবেগের জোয়ার যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। সেদিন বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষা করেছিলেন সালাম-বরকত-শফিক-জব্বারের মতো অমর ভাষাশহীদরা। তখন থেকেই পূর্ব-বাংলার বাঙালিরা পাকিস্তানী শাসকদের চোখ-রাঙানিকে উপেক্ষা করে আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বসন্তে প্রভাবিত হয়েছেন। বসন্তকে বুকে ধারণ করে তিনি বসন্তের ভাষায় আবেগায়িত হয়ে কথা বলেছেন। বলা যায় তিনি বাংলার এ ঋতুটি নিয়ে ভেবেছেন অনেক। তিনি বসন্তকে জানিয়েছেন :
অযুতবৎসর আগে, হে বসন্ত, প্রথম ফাল্গুনে/ মত্ত কুতুহলী/ প্রথম যেদিন খুলি নন্দনের দক্ষিণদুয়ার/ মর্তে এলি চলি/ অকস্মাৎ দাঁড়াইলে মানবের কুটির প্রাঙ্গণে/ পিতাম্বর পরি, / উতলা উত্তরী হতে উড়াইয়া উন্মাদ পবনে/ মন্দার মঞ্জুরি/ দলে দলে নর-নারী ছুটে এলো গৃহদ্বার খুলি/ লয়ে বীণা বেণু,/ মাতিয়া পাগল নৃত্যে হাসিয়া করিল হানাহানি/ ছুড়ি পুষ্পরেণু।। [বসন্ত : কল্পনা]
প্রেমিক কবি কাজী নজরুল ইসলাম ভালোবেসেছিলেন এক নারীকে। এই বসন্তেই তার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল। কিন্তু নয়ন সমক্ষে আর সেই নারী নেই। কবি এতদিনে প্রায় ভুলেও গিয়েছিলেন এই প্রেয়সীকে। কিন্তু বাদ সাধে আবার সেই চিরচেনা বসন্ত। বসন্তের গুঞ্জরণে কবির মনে পড়ে সেই হারানো মানবীকে যার সঙ্গে বসন্তে প্রথম দেখা হয়েছিল :
বইছে আবার চৈতি হাওয়া গুমরে ওঠে মন,/ পেয়েছিলাম এমনি হাওয়ায় তোমার পরশন।/ তেমনি আবার মহুয়া-মউ/ মৌমাছিদের কৃষ্ণা-বউ/ পান ক’রে ওই ঢুলছে নেশায়, দুলছে মহুল বন,/ ফুল-শৌখিন দখিন হাওয়ায় কানন উচাটন!/ [চৈতি হাওয়া : ছায়ানট]
বসন্তের পঙক্তিমালা সৃষ্টি করে যে কবি সবচেয়ে অধিক স্মরণীয় হয়েছেন তিনি পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। বলা যায়, অনেকটা সাধ্যাতীত ভাষায় এই মহান কবি অলঙ্কৃত করেছেন বসন্তের ভেতর-বাহিরের রূপরস। তার কলমের ছোঁয়ায় বসন্ত পেয়েছে ভিন্নতর মহিমা :
ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত/ সান-বাঁধানো ফুটপাতে/ পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাটখোট্টা গাছ/ কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে/ হাসছে।/ ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত। [ফুল ফুটুক না ফুটুক : ফুল ফুটুক]
শামসুর রাহমান স্বীকৃত নাগরিক কবি হলেও বসন্তের রঙ হৃদয়ে নাড়া দিয়ে গেছে তাকেও। বসন্ত বাতাস তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বসন্ত সবাইকে সমানভাবে রাঙায়। ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বসন্তের আগমনে আপ্লুত হয়। কেননা বসন্তের সৌন্দর্য সর্বজনীন :
অকস্মাৎ প্রিয়মিলনের মতো রঙিন শাড়ির/ ঝলক ছড়িয়ে আমাদের/ দুঃখের ধূসর গুঁড়োগুলো বিস্মৃতির/ অন্ধকারে ডুবিয়ে দাঁড়ায়/ বসন্তের জ্বলজ্বলে আলো নিয়ে ধনীর প্রাসাদে,/ দরিদ্রের বিরান আঙিনা আর ক্ষুধার্ত সংসারে। [বসন্তের মায়া : না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন]
বাংলা ভাষার আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ। বসন্তকে তিনি আগ্রাসী ঋতু বলেছেন। তার সবকিছু গ্রাস করে নেয় এ ঋতু। এ ঋতুর সৌন্দর্যে তিনি এতটাই মোহিত যে, তিনি একে অতিক্রম করতে পারেন না। খল এক-নারীর মতো তাকে গ্রাস করে রাখে :
এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,/ যতই এড়াতে চাই তাকে দেখি সে অনতিক্রম্য।/ বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখান/ নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে/ গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে। [বসন্ত বন্দনা : অচল পদাবলি]
রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী ঠাকুরবাড়ির বসন্ত উৎসব সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই উৎসবের একটি বিশেষ সাজ ছিল। সে হল হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না আর আতর গোলাপের গন্ধমাখা মালা। দোলের দিন সাদা মসলিন পরার উদ্দেশ্য ছিল যে, আবিরের লাল রঙ সাদা ফুরফুরে শাড়িতে রঙিন বুটি ছড়িয়ে দেবে।’ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে ‘বসন্তোৎসব’ এক অসাধারণ ও অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে। সেদিন শান্তিনিকেতনে মেয়েরা হলুদ শাড়িতে, চুলে লাল পলাশ ফুল দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে তোলে। শাল শিমুল পলাশে ঘেরা শান্তিনিকেতনের অনন্যসাধারণ প্রকৃতিতে সংগীত আর আবিরের ছোঁয়া লেগে রঙিন হয়ে ওঠে চতুর্দিক।
পৃথিবীতে প্রেমের এই আক্রার দিনে প্রেমের এই উৎসব রঙিন হয়ে আমাদের মন মাতিয়ে তোলে। গুলাল ছড়ায় মনে। তাই আমাদের শানানো কলমে ছুটে যায় গোপন চিঠি, বলি, কলম শানাই সূক্ষ্ম করে, থমকে দাঁড়াই অর্ধপথে,/ দেখা করো সন্ধ্যে বেলায়, চিঠি দিলাম বসন্তকে।
নব বসন্ত সবাইকে নিজের মায়ামন্ত্রে আচ্ছন্ন করে রাখে। নব বসন্ত বাঙালির প্রাণে নতুনত্বে প্রাণ সঞ্চার করুক এটাই হোক বসন্ত বরণের অভিপ্রায়। আসুন, আমরা সবাই নব বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তুলি নিজেদের। সাথে থাকুন, পাশে রাখুন। জয়গুরু! জয়গুরু! জয়গুরু!

নব বসন্তের কবিতা- ১০
কবি- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী
বসন্ত এলো আজি বসন্ত আসিলো।
কাননের কলি যত সকলি ফুটিলো।
তরুশাখে পত্রবৃন্তে
রং লাগে বসন্তে
পুষ্পরাশি ছন্দে ছন্দে প্রস্ফুটিত হলো,
মধু আহরণ লাগি অলিরা আসিলো।

বসন্ত এলো আজি বসন্ত আসিলো,
কাননের কলি যত সকলি ফুটিলো।
বসন্তের কিশলয়,
পত্রে পল্লবিত হয়
আজি তাই মনে হয়, ফাগুন আসিলো,
বসন্ত এলো আজি বসন্ত আসিলো ।

বসন্ত এলো আজি বসন্ত আসিলো,
কাননের কলি যত সকলি ফুটিলো।
দিবসের অবসানে
হেরি পশ্চিমের পানে
রঙীন আবীর মাখি, অরুণ ডুবিলো,
ঘরে ঘরে জ্বলে দীপ আঁধার নামিলো।

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes