ভাইয়ের রক্তে ভাইফোঁটা দীপাবলী সংকলন-১৪২৬

ভাইফোঁটার পৌরাণিক ইতিহাস
তথ্যসংগ্রহ ও সম্পাদনা- লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা,
যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই
আমার ভাইকে ফোঁটা।।”
ভাইফোঁটা দেওয়ার সময় বোনেরা ছড়া কেটে বলছে বটে, কিন্তু ঋগ্বেদে যমুনা ওরফে যমী কি আদৌ যমকে ভাইফোঁটা দিয়েছিলেন? উত্তরটা হল ‘না’। আসুন, ঋগবেদে বর্ণিত যম ও যমীর উপাখ্যানে একটু মনোনিবেশ করি।
যম ও যমী যমজ ভাতৃ-ভগিনী। তাদের পিতা বিবস্বান বা সূর্য আর মাতা আপ্যা ঘোষা বা ঊষা। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম সূক্তের চোদ্দটি শ্লোক বলছে, বিস্তীর্ণ সমুদ্র মধ্যবর্তী এক দ্বীপের নির্জন প্রদেশে সমাগম হলেন যম ও যমী। সেখানে যমের সঙ্গে সহবাসের জন্য অভিলাষিণী হয়ে উঠলেন যমী। বললেন, ‘গর্ভাবস্থা অবধি তুমি আমার সহচর। বিধাতা মনে মনে চিন্তা করে রেখেছেন তোমার ঔরসে আমার গর্ভে আমাদের পিতার এক নাতি জন্মাবে’।
কথাটা শুনে যম চিত্রার্পিত হয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সামলে নিয়ে এই পাপকার্যে অসম্মতি প্রকাশ করে তিনি যুক্তি দেখালেন– ‘আমি তোমার সঙ্গে অজাচারে (ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে যৌন-সংসর্গকে অজাচার বলে) লিপ্ত হতে পারব না। কেননা, তুমি সহোদরা। তুমি অগম্যা। আর এই স্থান নির্জন নয়, কারণ মহান স্বর্গধারনকারী দেবতারা পৃথিবীর সর্বত্র দেখছেন’।
যমী কিন্তু নাছোড়বান্দা। তিনি প্রতিযুক্তি দেখালেন, ‘কেবলমাত্র মনুষ্যের পক্ষেই এরূপ সংসর্গ নিষিদ্ধ। কিন্তু দেবতারা এরূপ সংসর্গ ইচ্ছাপূর্বক করে থাকেন। আমার এখন কাম জাগছে, তুমিও জাগাও। পুত্রজন্মদাতা পতির মতো প্রবেশ কর আমার শরীরে’। যমীর এই যৌন আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন যম। জানালেন, ‘আমি কদাপি এরূপ কার্য করিনি। আমরা একই পিতামাতার যমজ সন্তান। আমাদের মধ্যে অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আমি এরূপ সম্পর্ক স্থাপনে অপারগ’।
যমী কিন্তু নিরস্ত হলেন না। প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন নিজের যুক্তি– ‘আমরা যমজ।গর্ভেই আমরা একত্র শয়ন করেছি। সুতরাং গর্ভাবস্থাতেই আমরা বিবাহিত পতিপত্নীবৎ। নির্মাণকর্তা এভাবেই আমাদের সৃষ্টি করেছে। তাঁর অভিপ্রায় অন্যথা হয় না। আমাদের এ সম্পর্ক পৃথিবী ও আকাশ উভয়ই অবগত’। এরপরেই বাহুদ্বয় প্রসারিত করে আহ্বান জানালেন, ‘হে ভ্রাতা, এসো একস্থানে উভয়ে শয়ন করি। তোমার নিকট নিজ দেহ সমর্পণ করি যেভাবে পত্নী তার পতিকে শরীর সমর্পণ করে। তোমার শরীরে আমার শরীর মিলিয়ে দাও।এসো, রথের চক্রদ্বয়ের মতো এক কার্যে প্রবৃত্ত হই।’
যম এই প্রস্তাবে পরাঙ্মুখ হয়ে বললেন, ‘হে সুন্দরী! তুমি অন্য পুরুষকে পতি হিসেবে বরণ করো। তারই বাহুলগ্না হও।’
যমী রাগত স্বরে বললেন, তুমি কিসের ভ্রাতা যে ভ্রাতা থাকতেও ভগিনী অন্যথা হয়, সুখ-সম্ভোগে বঞ্চিতা হয়?
‘আমার এরূপ কোন অভিলাষ নেই। যে ভ্রাতা ভগিনীতে উপগত হয় সে পাপিষ্ঠ। আমি এরূপ পাপকর্ম করতে পারব না।’ যম বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
যমী এতেও ক্ষান্ত হচ্ছেন না। নিজের যৌনসুখ চরিতার্থ করতে অন্তিম চেষ্টাটুকু চালিয়ে যাচ্ছেন। যমের আরও নিকটবর্তী হয়ে যমী বললেন, ‘তোমার কেমন মন, কেমন অন্তঃকরণ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই যে অভিলাষে মূর্ছিতা হয়ে এত করে বলছি আমায় তৃপ্ত কর, তুমি নিজেও পরমানন্দ লাভ কর শুনছ না! রজ্জু যেভাবে ঘোটককে বেষ্টন করে, লতা বৃক্ষকে; সেইভাবে আমাকে তুমি আলিঙ্গনাবদ্ধ কর। অথচ তুমি নির্বিকার।’
যমীর এত যৌনগন্ধী কথা, আবেদন-নিবেদন শ্রবণ করেও যম বিমুখ। তিনি নিজেকে সংযত রাখলেন। বললেন, ‘হে ভগিনী! তুমি অন্য পুরুষের সঙ্গে সহবাসের ব্যবস্থা করো। তাতেই তোমার মঙ্গল হবে।’
ভ্রাতার সঙ্গে যৌনমিলনে ব্যর্থ যমী যমকে সখেদে বললেন, ‘হায়! যম! তুমি নিতান্তই দুর্বল পুরুষ দেখছি!’
লক্ষ্যণীয়, এই কাহিনির কোথাও কিন্তু পাওয়া গেল না যম তাঁর ভগিনী যমীর হাতে ভাইফোঁটা নিয়েছিলেন। তাই ঋগ্বেদ উচ্চকণ্ঠে দাবি করতেই পারে যমী যমকে ভাইফোঁটা দেননি। পুনশ্চ: যম ও যমীর আদি অর্থ দিন ও রাত্রি। রাত্রি দিনের পশ্চাতে আসে, তাই তাদের মিলন হয় না।


ভাইয়ের রক্তে ভাইফোঁটা
দীপাবলী সংকলন-১৪২৬

কবি লক্ষ্মণ ভাণ্ডারী

অশ্রু ঝরানো ভাইফোঁটা আজ বাংলার ঘরে ঘরে,
ছিন্ন হয়েছে স্নেহের বন্ধন দুই নয়নে অশ্রু ঝরে।
সংসারে আজ অশান্তির ঝড় ভেঙেছে খেলাঘর,
অশান্তিতে জ্বলেপুড়ে মরে ভাই বোন আজ পর।

ভাইবোনে মিল নেই আজ ভাই নাহি চেনে বোন,
খবর রাখেনা কেহ কারো করে নাকো কভু ফোন।
আত্ম কলহে মেতে ভাইবোন জ্বলে পুড়ে হিংসায়,
পাড়াপ্রতিবেশী মুখ টিপে হাসে করে না হায় হায়।

বর্ষে বর্ষে ভাইফোঁটা আসে, আসে নাকো কভু ভাই,
বোনের দুচোখে অশ্রুজল ঝরে ভাই বুঝি তার নাই।
হাসির চেয়ে কান্না যে দামী আজকের ভাইফোঁটায়,
হিসাব রাখি না আজও কারা কাঁদে নিষ্ঠুর দুনিয়ায়।

কবিতার পাতায় বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহিনী বোন কাঁদে,
ঠকে শেখো বোন বিদ্রোহ করো পড়ো না কভু ফাঁদে।
গর্জে উঠুক বোনেরা সবাই মুছে ফেলুক ভ্রাতৃত্ববোধ,
ভাইয়ের রক্তে ভাইফোঁটা দিয়ে নিতে হবে প্রতিশোধ।

0.00 avg. rating (0% score) - 0 votes